নাতনির কাছে দাদুর ফেসবুকের হাতেখড়ি: মজার কথোপকথন

 - মিঠি...মিঠি... ঘরে আছিস?


- হ্যাঁ, কি বলছো দাদুভাই? কিছু বলবে? দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছো কেনো? ঘরে এসো।


- না, থাক। তুই এখন পড়াশোনা করছিস। বিরক্ত করব না। আমি নাহয় পরেই আসবো।


- আরে, দাদুভাই... ইম্পর্ট্যান্ট কিছুই করছিলাম না। কলেজের প্রজেক্টের খাতা গুলো জাস্ট সাজিয়ে রাখছিলাম। আমার অলমোস্ট কমপ্লিট। তুমি কি বলতে এসেছিলে বলো। আর এখানে আগে বসো দিকি।


- ওহঃ বলছি মিঠি তোর কাছে এখন বেশ কিছুক্ষণ ফাঁকা সময় আছে ?


-হ্যাঁ, তুমি বলো না কি করতে হবে।


- দেখ না মিঠি তোর বাবাকে এত করে বারণ করলাম এই বড় ফোন কিনে দিতে হবে না। সেই কথাই শুনলো না। আমি এখন এটা ব্যবহার করি কি করে বল দিকি? এত করে বললাম ছোট ফোনটা সারিয়ে দিলেই হবে। তা কেন? সেই বড়ো ফোনই কিনে দিল। 


- বাবা তো ঠিক কাজই করেছেন। এখন আর সুইচ টেপা ফোন নিয়ে কি করবে? বরং এই স্মার্ট ফোনটাই এখন তোমার সারাদিনের সঙ্গী হয়ে উঠবে দেখবে। তোমার অবসর সময়টা বেশ ভালো কাটবে। আমিই তো অনলাইন থেকে এটা অর্ডার দিয়েছিলাম। বাবা দিতে বলেছিলেন। তোমার পছন্দ হয় নি দাদুভাই?


- পছন্দ তো হয়েছে। কিন্তু এ ফোনের মাথা মুন্ডু আমি কিছুই করতে পারছি না। যেন মনে হচ্ছে স্কিনটায় টাচ করলে ভেঙ্গেতেঙে যাবে নাকি?


- দাদুভাই, তুমি টেনশন কোরো না। আমি তোমায় সবটা শিখিয়ে দেবো।


- এই... মিঠি, তোকে চুপিচুপি একটা কথা জিজ্ঞাসা করব কাউকে বলে দিবি না তো?


- কি কথা দাদুভাই? তুমি নির্ভয়ে আমায় বলো। আমি কাউকে বলবো না। 


- তোর থাম্মিকেও কিন্তু বলা চলবে না। 


- তাহলে তো দেখছি ব্যাপারটা খুব সিক্রেট।


- বলছি ঐ কি যেন বলে... হ্যাঁ মনে পড়েছে ফেসবুক। ওটা কি জিনিস বলতো? এখনকার ছোটো থেকে বড় সবাইয়ের মুখে শুনছি এই নামটা। সেদিন তো তোর পিসিও তো ফেসবুকে কত ছবি দেখছিল। বলছি কি... শোন না... ওটা এই ফোন থেকে করা যাবে রে?


- দাদুভাই...তুমি ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট খুলতে চাও? 


- আরে, চিৎকার করছিস কেনো? সবাই জানতে পেরে যাবে তো?


- ও! সরি দাদুভাই। আসলে তোমার কথা শুনে আমি বড্ড বেশি একসাইটেড হয়ে গিয়েছিলাম। তাই একটু বেশি রিয়্যাক্ট করে ফেলেছি। হ্যাঁ এই স্মার্টফোনটা থেকে তুমি ইজিলি ফেসবুক অ্যাপ ওপেন করতে পারবে। চলো আমি তোমায় এখনই ফেসবুক অ্যাকাউন্ট করে দিই।


- এতে কি কি হয় রে মিঠি?


- অনেক কিছু। তুমি পুরোনো দিনের সব ফ্রেন্ড দের এর মাধ্যমে খুঁজে পেতে পারো। যাদের সাথে এতদিন তোমার কথা সাক্ষাৎ ছিল না। তাদের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দিলে তারা তোমার সাথে কানেক্ট হলেই তাদের সাথে তোমার যোগাযোগ হবে। তাদের ছবি দেখতে পারবে। তোমার ছবিও তারা দেখতে পারবে। মেসেজে কথা বলতে পারবে। তাছাড়া ফেসবুক একটা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। এখানে নানারকম রিলস, ভিডিও, নিউজ দেখতে পারবে। অনেক উঠতি লেখক দের সুন্দর সুন্দর গল্প পড়তে পারবে। গান শুনতে পারবে। সব কিছু সুবিধা আছে। মানে তোমার সারাদিনটা খুব ভালো কাটবে। ঘরের ভিতর বন্দি হয়ে সারাক্ষণ বসে থাকো, এখানে সময় কাটালে দেখবে তোমার মনটা ফ্রেশ হয়ে যাবে। আর কখন যে সময় বয়ে যাবে বুঝতেও পারবে না।


- ওহ: বাবা! এত্ত কিছু হয়?


- হ্যাঁ গো দাদুভাই। সব কিছু হয়। আর তোমার বয়সীও কত মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করে তুমি জানো? ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট করাটা খারাপ নাকি? ঠাম্মি জানলেও কিচ্ছু হবে না।


- তুই তাহলে অভয় দিচ্ছিস?


- একদম দাদুভাই। তুমি নিশ্চিন্তে এটা ব্যবহার করতে পারো।

- তাহলে আমায় একটু শিখিয়ে দে।


- দাঁড়াও। ওয়েট করো। প্রথমে তোমায় ফেসবুকে একটা অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে। তারজন্য তোমার একটা সুন্দর ছবি দিতে হবে।


- তাহলে দুর্গা পূজোর সময় তোলা তোর ঠাম্মির সাথে একটা ছবি আছে। ওটাই তাহলে দে।


- বাহ! দাদুভাই...তুমি তো দেখছি হেব্বি রোমান্টিক। 


- ধুর পাগলী , আর কি কি তথ্য দিতে হবে বল।


- এই তো... তোমার নাম লিখে দিলাম। তোমার বয়স তো জানিই দিয়ে দিয়েছি। কোন স্কুল, কোন কলেজে পড়তে সবই ডিটেলস দিতে হয় এখানে। আর এসব তো আমি জানিই। তাই দিয়ে দিলাম। এবার তুমি বলো কোন ভাষায় তুমি বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করো। এখানে অপশন আছে বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি? তুমি তো তিনটিই জানো। তা তিনটে তেই টিক দিয়ে দিই?


- হ্যাঁ দে। এই মিঠি... আমার একটা কলেজের বন্ধু আছে। ও এখন ওর ছেলের কাছে থাকে আমেরিকা তে। বা সাথে যোগাযোগ করা যাবে?


- হ্যাঁ। এখন তো শুধু প্রোফাইল পিকচার করে দিলেই তোমার ফেসবুক একাউন্ট ওপেন হয়ে যাবে। আর মাত্র দুমিনিট অপেক্ষা করো। তারপর তোমার যার যার কথা মনে পড়ছে আমায় বলো আমি সার্চ করে দেখছি যদি পাই ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দেবো। তারা একসেপ্ট করে নিলেই তুমি তাদের সাথে কানেক্ট হয়ে যাবে। 


-  এবার বলো তোমার ওই আমেরিকা বাসি বন্ধুটির নাম কি ?


- অমল চন্দ্র দাস লিখে সার্চ কর দেখি।


- আচ্ছা, আমি সার্চ করছি। কিভাবে করতে হয় তুমি ব্যাপারটা ভালো করে দেখে বুঝে নাও। তাহলে তুমি এরপর নিজেই পারবে সার্চ করে রিকোয়েস্ট পাঠাতে।


- ঠিক আছে। আমি দেখছি। 


- দেখো, দাদুভাই ঐ নামটা সার্চ করে মোট সাত জনকে দেখাচ্ছে। এর মধ্যে থেকে তোমার বন্ধু কোনটি ছবি দেখে চিনতে পারবে?


- কই দেখি।


- দেখো 


- এই তো...এই তো ব্যাটাকে এতদিন পর খুঁজে পেয়েছি। উফফ! চুল পেকে , চামড়া কুঁচকে সেই আমলের আর আগের মতো চাকচিক্যে ভরা চাহারাটা কোথায় হারিয়ে গেছে।


- তা তো হবেই দাদুভাই। তোমার বয়স এখন বিরাশি। তাঁরও তো তাই। তাহলে চেহারা তো বয়সের জন্য ভেঙে পড়বেই।


- তা বটে, ঠিক ঠিক। দে...দে...ওকে একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দে।


- তুমি দাও দাদুভাই। আমি তোমায় দেখিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছি এরপর তুমি নিজেই করতে পারবে।


- এই যে এটা তোমার বন্ধুর একাউন্ট তো... এখানে দেখো এড ফ্রেন্ড অপশন আছে। ওখানে ক্লিক করে দিলেই রিকোয়েস্ট চলে যাবে। উনি দেখলেই তোমায় একসেপ্ট করে নেবেন। 


- এতো খুবই সোজা প্রসেস রে সমস্ত কিছুই তো লেখা আছে শুধু দেখে দেখে ক্লিক করলেই হবে।


- হ্যাঁ দাদুভাই। তুমি ঠিক বলেছো। দু - চারদিন ফেসবুক নিয়ে নাড়াচাড়া করলেই সব কিছু রপ্ত করে ফেলবে। 


- মোবাইলে যেমন মেসেজ লেখে ফেসবুকেও কি একই ভাবে হয়?


- হ্যা,  ওই মেসেজ চিহ্ন দেখাচ্ছে ব্লু রঙের দেখতে পাচ্ছ?


- হ্যাঁ... হ্যাঁ... ওটায় ক্লিক করলেই মেসেজ সেকশন খুলে যাবে তাই তো? 


- হ্যাঁ দাদুভাই। তুমি কিন্তু স্টুডেন্ট হিসেবে খুব ইন্টেলিজেন্ট।


- মিঠি আমাদের চেনা পরিচিত যাদের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আছে সবাইকে তাহলে রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দিই বল?


- হ্যাঁ। আমাকেও পাঠিয়ে দাও দেখি কেমন শিখলে।


- দেখ। সেন্ড করেছি। গেছে কি না।


- একদম। দাদুভাই...গুড জব। তুমি চালিয়ে যাও তোমার কাজ। তারপরের স্টেপ গুলো নিজে নিজে চেষ্টা করবে। নাহলে আমি তো আছিই।


- এবার তোর ঠাম্মি জব্দ হবে।


- কেনো গো? ঠাম্মিকে আবার জব্দ করবে কেনো?


- দেখিস না, বুড়ি সবসময় আমায় খিটখিট করে আমার খুঁত খুঁজে বেড়ায়। আমি এবার সারাদিন ফেসবুকে জমিয়ে আড্ডা দেব। ওকে পাত্তাই দেবো না। এবার বুঝবে ঠ্যালা।


- এই রে... এটা কিন্তু ভারী অন্যায় দাদুভাই। আমি কিন্তু তাহলে তোমার দলে থাকবো না।


- আমায় কত জ্বালায় তুই জানিস না।


- তাহলে আমি ভাবছি ঠাম্মিকে মেজ কাকুর বাড়ি কলকাতায় দু মাসের জন্য পাঠিয়ে দিতে বলবো বাবাকে।


- এই না... না... তার দরকার নেই। ওকে ছাড়া যে আমার চলবেও না রে। যতই আধুনিক প্রযুক্তির রমরমা বাড়ুক, সারা দুনিয়া হাতের মুঠোয় হোক তবু কাছের মানুষের মান অভিমান ঝগড়া ছাড়া যে দিন চলবে না রে। পাঠাস নি মিঠি তোর ঠাম্মিকে। এই বুড়ো বয়সে আমাদের আলাদা হওয়ার কথা বলিস না। বুকে বড্ড লাগে।


- জানি তো তুমি ঠাম্মিকে ভীষণ ভালোবাসো। আমি শুধু তোমায় একটু পরীক্ষা করছিলাম।


সমাপ্ত










একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ